Sunday, November 15, 2009

শেয়ারবাজারে যত কাজ

দেশের শেয়ারবাজারের সূচক এখন ঊর্ধ্বমুখী। শেয়ারব্যবসা জমজমাট।শুধু বিনিয়োগকারীরাই ব্যবসা করছেন না, শেয়ারবাজারকে ঘিরে দেশেই গড়ে উঠেছে নানা ধরনের আর্থিক ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। আরও নতুন নতুন কাজের জায়গা সৃষ্টি হচ্ছে।বৈচিত্র্যময় কাজের সুযোগ বাড়ছে।শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ তো আছেই, পাশাপাশি শেয়ারব্যবসাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানে পেশাজীবন গড়ার সময় এখনই।

শেয়ার কী
শেয়ার হলো মালিকানার অংশ। বাণিজ্যিক ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের পুঁজি গঠনে স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকাভুক্ত হয়ে জনসাধারণের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র মালিকানার দলিল বিক্রি করে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্রোকার হাউসের মাধ্যমে মালিকানা কেনাবেচার সুযোগ পায়। শেয়ার ব্যবসার মাধ্যমে মূলধনি লাভ, লভ্যাংশ বা অন্যান্য প্রাপ্তির সম্ভাবনা থাকে। প্রতিটি শেয়ার একেকটি অঙ্গীকারনামা, যেখানে কোম্পানির লভ্যাংশ শেয়ারের মালিককে দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ থাকে। এটি একটি স্বাধীন ব্যবসা। যেকোনো পেশায় থেকেও শেয়ারব্যবসা করা যায়। এতে কোনো বাধা নেই।

নানা ধরনের কাজের সুযোগ
ক্রমবর্ধনশীল শেয়ারবাজারে বিগত কয়েক বছরে সুযোগ বড়েছে কয়েক গুণ। বর্তমানে অনেকেই শেয়ারব্যবসায় আগ্রহী হচ্ছে। শেয়ারব্যবসায় ভবিষ্যত্ও বেশ ভালো। বর্তমানে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) মাধ্যমে দেশের শেয়ারব্যবসার লেনদেন হচ্ছে।
শেয়ারবাজারে বৈচিত্র্যময় কাজের সুযোগ সম্পর্কে আইডিএলসি ফাইন্যান্স লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ খান বলেন, এ সময় অনেক বেশি বিনিয়োগকারী শেয়ারবাজারে তাঁদের অর্থ বিনিয়োগ করছেন। বর্তমানে দেশে প্রায় ২০ লাখ বিও (বেনিফিশিয়ারি ওনার্স) হিসাব (অ্যাকাউন্ট) সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। গত তিন বছরে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বেড়েছে পাঁচ-ছয় গুণ। তবুও আমাদের দেশে এ বাজার এখনো অনেক ছোট। বর্তমানে আমাদের বাজারে মূলধনের পরিমাণ দেশের জিডিপির শতকরা ২০ ভাগ। অথচ ভারতে জিডিপি ও মূলধনের অনুপাত শতভাগ। পাকিস্তানেও তা শতকরা ৪০ ভাগ। সুতরাং আমাদের বাজার বাড়ানোর সমূহ সুযোগ আছে। আগামী ১০ বছর এ ক্ষেত্রটি যে বাড়বেই, এটা নিশ্চিত।
বর্তমানে যে হারে বাজার বাড়ছে, তাতে এই খাতে হাজার হাজার বেকারের কর্মস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো বিষয়টিকে খুবই গুরুত্ব দিচ্ছে। পাশাপাশি সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন বিনিয়োগকারীদের আরও বেশি উত্সাহী করতে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ দিচ্ছে। এতে নতুন ও তরুণদের ব্যাপক আকারে সম্মানজনক পেশায় নিয়োজিত হওয়ার দুয়ার উন্মুক্ত হচ্ছে বলে তিনি মত দেন।
প্রাইম ফিন্যান্স অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি লিমিটেডের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মঈন আল কাশেম বলেন, আগে শেয়ারবাজারে ব্রোকার হাউসগুলো আড়তদারি করত। ক্রেতা ও বিক্রেতাকে মিলিয়ে দিত। সময় বদলে গেছে এখন। ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে শেয়ার কেনাবেচা হওয়ার ফলে ব্রোকার হাউসগুলোরও কাজের ধরন বদলে গেছে। আবার শেয়ারবাজারে ব্যাংক-বীমাগুলো স্বতঃস্ফূর্ত প্রবেশ বাজারে নানা ধরনের কাজের সুযোগ তৈরি করছে। আমাদের দেশেও এখন সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান (অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি) গড়ে উঠেছে, যেখানে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞদের কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এ শাখায় দক্ষ জনশক্তির অভাব রয়েছে।তাই মেধাবী, যোগ্য ও সত্ প্রার্থীদের সুযোগ অনেক বেশি। এ ছাড়া পুরো প্রক্রিয়াটি প্রযুক্তির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হওয়ায় কম্পিউটার জানা মানুষের কাজের সুযোগ বাড়ছে।
তিনি শেয়ারবাজারের নতুন অথচ সম্ভাবনাময় শাখা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি সম্পর্কে বলেন, এ শাখায় কাজের সুযোগ কম হলেও তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলো শেয়ারব্যবসার সঙ্গে জড়িত সব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করে। বর্তমানের ক্রমবর্ধমান বাজারকে আরও বেশি কার্যকর করতে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব সময়ের দাবি।
ব্রোকার হাউসগুলোতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্পর্কে প্রাইলিংক সিকিউরিটিজের চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘শুধু ঢাকাতেই ২৩৭টি ব্রোকারেজ হাউস তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন ব্রোকারেজ হাউসগুলোকে সর্বোচ্চ ১৫টি শাখা খোলার অনুমতি দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি এই শাখাগুলোর প্রতিটিতে ন্যূনতম পাঁচজন (একজন ব্যবস্থাপক, দুজন অনুমোদিত প্রতিনিধি, একজন তদারক কর্মকর্তা ও একজন অফিস সহকারী) কর্মী নিয়োগের নিয়ম রেখেছে। জনবল নিয়োগের এ সংখ্যা হাউসগুলোর ব্যাপ্তি অনুযায়ী আরও বেশি হতে পারে।
তিনি আরও জানান, আগে ব্রোকার হাউসগুলোতে শুধু শেয়ার কেনাবেচা ও লেনদেনের বিষয় ছিল। এখন সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন আমাদের ডিলারশিপ দিচ্ছে। এতে ব্রোকার হাউসগুলোর কাজে পেশাদারি বিষয় চলে এসেছে। এখন বিনিয়োগকারীদের সুবিধার্থে আমরাও তাদের হয়ে বাজারে সক্রিয় অংশ নিতে পারব। ফলে নতুনদের কাজের সুযোগ বাড়ছে।’

কাজের সুযোগ নানা রকমের
শেয়ারবাজার চাঙা হওয়ার ফলে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতিষ্ঠান এই খাতে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তারা নানা ধরনের সম্প্রসারিত কাজ নিয়ে শেয়ারবাজারে যুক্ত হচ্ছে। ফলে দেশীয় পুঁজিবাজার সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে উন্নয়ন ঘটছে ও প্রবৃদ্ধির হার বাড়ছে।
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে ভালো আয়ের সুযোগ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি এই শাখায় আরও বেশ কিছু কর্মস্থানের সৃষ্টি হয়েছে।
এগুলো হলো:
 ব্রোকার হাউসগুলোতে কাজের সুযোগ
 মার্চেন্ট ব্যাংকিং/শেয়ার সংশ্লিষ্ট ব্যাংকিং
 অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি
 বীমা প্রতিষ্ঠানে কাজ
 শেয়ারবাজারে মূলধন লগ্নিকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরির সুযোগ

যেমন যোগ্যতা চাই
শেয়ারবাজারে এখন যে ধরনের চাকরির সুযোগগুলো তৈরি হচ্ছে, সে জন্য শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা থাকা দরকার।এ ছাড়া এই খাতে বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থীদের ভালো করার সম্ভাবনা বেশি হলেও অন্যান্য বিষয়ে স্নাতক, সত্ ও মেধাবীদেরও অবারিত সুযোগ আছে। শেয়ারবাজার যেহেতু এক ধরনের তহবিল রক্ষণাবেক্ষণ ও সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে, তাই এখানে ন্যায়নিষ্ঠা থাকা জরুরি। যিনি কাজ করবেন, তাঁকে মূলধন ও বাজার সম্পর্কে জানতে হবে। যেহেতু এই খাতটি খুবই প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক, তাই ভালো করার সদিচ্ছাটা খুবই জরুরি। তথ্যপ্রযুক্তি ও কম্পিউটারবিষয়ক জ্ঞান থাকতে হবে।

প্রস্তুতি ও পরিকল্পনা
পেশা ভাবনার শুরুতে যাঁরা এই শেয়ারবাজারে বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার কথা ভাবছেন, তাঁরা বিবিএ বা এমবিএ পড়তে পারেন। এ ছাড়া অর্থনীতি, হিসাববিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা যাঁরা পড়ছেন, তাঁদেরও পেশা পরিকল্পনার অন্যতম পছন্দ হতে পারে শেয়ারবাজারকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। যেহেতু আমাদের দেশে বাজার সবে বিকশিত হচ্ছে, সুতরাং এখনই যাঁরা চাকরিতে ঢুকতে পারবেন, তাঁদের ভবিষ্যত্ তত ভালো হওয়ার সম্ভাবনা।

দক্ষতা বাড়ানোর সুযোগ
একমাত্র কাজের অভিজ্ঞতাই এ পেশায় দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হবে। কেননা, আমাদের দেশে এ বিষয়ে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। অথবা কোনো ধরনের কর্মশালা বা প্রশিক্ষণেরও কোনো সুযোগ নেই। তবে যেসব প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজারসংশ্লিষ্ট কার্যক্রম শুরু করেছে, তারা নিজেদের স্বার্থে এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণভাবে নানা ধরনের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছে। এ বিষয়ে স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশনের কিছু বাধ্যবাধকতাও আছে। দেশের বাইরে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত, জাপান, ইতালি, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন ধরনের ডিগ্রি লাভের সুযোগ আছে। এখন সিকিউরিটিজ ও স্টক এক্সচেঞ্জ কমিশন নতুন বিনিয়োগকারীদের স্বল্প মেয়াদে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করছে।

No comments: